Onushondhan News

সরকারি আবাসন বরাদ্দ পেতে থাকছে না ভোগান্তি-দুর্নীতি; বেকায়দায় অসাধু কর্মচারীরা

মুনিরুল তারেক:

বিভিন্ন দপ্তরের চাকরিজীবীদের ঢাকা শহরে সরকারি আবাসন বরাদ্দ পেতে ভোগান্তি-দুর্নীতির অভিযোগ বহু পুরানো। প্রত্যাশির তুলনায় আবাসনের সংখ্যা অতিনগন্য হওয়ায় এ নিয়ে গড়ে উঠেছিলো দালাল সিন্ডিকেট। তাদের তৈরি করা ঘুষ বাণিজ্যের প্রক্রিয়ার পথে না হাটলে মিলতো না সরকারি আবাসন। তবে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে শুরু করেছে। ডিজিটালের ছোঁয়ায় লাগাম পড়ছে অসাধু সিন্ডিকেটের শক্তিতে।

সরকারি বাসা, অফিস কিংবা গ্যারেজ বরাদ্দ দিয়ে থাকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘সরকারি আবাসন পরিদপ্তর’।

ওই পরিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিক থেকে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া বাতিল করে অনলাইনের মাধ্যমে শতভাগ আবেদন নেয়া হচ্ছে। আর ওয়েবসাইট থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম। ইতোমধ্যে এই ডিজিটাল পদ্ধতি আবাসন পরিদপ্তরের ওয়েবসাইটে চালু হয়েছে। তবে আবাসন বরাদ্দের আবেদন গ্রহণের জন্য পৃথক ওয়েবসাইটও রয়েছে (www.bashaonline.com)।

সূত্র বলছে, এতে করে ঘুষ লেনদেন কিংবা দালাল সিন্ডিকেটের কাছে ধর্ণা দেয়া থেকে মুক্তি পাবেন সরকারি আবাসন প্রত্যাশিরা। পাশাপাশি- কে বরাদ্দ পাবেন, তা অনলাইন লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ হওয়ায় এ নিয়ে কোনো ধরনের দ্বিধা কিংবা অস্বচ্ছতা থাকবে না। তবে শোনা যাচ্ছে ওই দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবৈধ বাণিজ্যে এখনো সক্রিয়। যে কারণে সরকারি বাসা পাওয়ার নতুন প্রক্রিয়া অবহিত করা এবং দালালমুক্ত থাকার সতর্ক বার্তা সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রচারণা দরকার।

ওই সূত্রের দাবি, আবাসন পরিদপ্তরের দীর্ঘ দিনের দুর্নাম ঘোচাতে যারপরনাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পরিচালক মোঃ আব্দুস সবুজ মন্ডল পিএএ। তিনিই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে তিনি পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর পরই আবাসন বরাদ্দ পেতে ঘুষ বাণিজ্য, হয়রানির শিকারসহ অনেক অভিযোগের জনশ্রুতি রয়েছে বলে জানতে পারেন। এরপর তিনি পরিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সুনাম ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করলে অনেকেই তাতে সাড়া দেন। আবার দালাল সিন্ডিকেটে জড়িত অনেকে নাখোশও হন। তাতে নজর না দিয়ে স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী সহকর্মীদের নিয়ে শুদ্ধি অভিযানে নামেন আব্দুস সবুর মন্ডল। শুরুতেই অতিবিতর্কিত কয়েকজনকে ঢাকার বাইরে এবং আভ্যন্তরীণ বদলি করেন। পাশাপাশি দালাল সিন্ডিকেটে জড়িতদের হুশিয়ার করেন। তাদের অসাধু কর্মকাণ্ড বানচাল করে দিতে ম্যানুয়াল আবেদন গ্রহণ ও বরাদ্দ প্রদান প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ হিসেবে সার্বিক বিষয়গুলো ডিজিটাল মাধ্যমে নেয়ার পদ্ধতি চালু করেন। আর তার এই উদ্যোগকে সফল করতে পূর্ণ সহযোগিতা করছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এমপি এবং সচিব মোঃ শহীদ উল্লা খন্দকার।

আবাসন প্রত্যাশি পরিচয়ে পরিদপ্তরের একজন অফিস সহকারীর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, এখন আর আগের মত অবস্থা নেই। একটা সিন্ডিকেট আছে যারা কাজ করে দেবে বলে টাকা নেয়। আগে কাজ করতে পারতো তারা। দেখা যায় ১০ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ৫ বা ৭ জনকে বরাদ্দ এনে দিতে পারতো। বাকিদের টাকা আত্মসাৎ করতো। কিন্তু এখন কোনো সুযোগই নেই। যদি কেউ বরাদ্দ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে থাকে তারা প্রতারণা করছে।

পরিদপ্তরের একজন পদস্ত কর্মকর্তা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, পরিচালক মহোদয় যোগদানের পর থেকেই এখানে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা নিয়ে আলোচনা-পরিকল্পনা করছেন। কিছু কিছু কাজে তা দৃশ্যমান। তিনি (পরিচালক) কি প্রক্রিয়ায় কাজ করছেন, তা জানা নেই। তবে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে চিহ্নিতরা অনেকটা নীরব হয়ে গেছেন। অনেকেই তার কাজে খুশি নয়। এমনও শোনা যায়- তাকে এখান থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা চলছে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মোঃ আব্দুস সবুর মন্ডল পিএএ’র সঙ্গে। তিনি বলেন, বাসার সংকটের পরিমাণ অত্যাধিক বেশি। ১শ’ জন লোক আবেদন করলে তার মধ্যে মাত্র ৭ জনকে দিতে পারি। ৯৩ জনই পাচ্ছেন না। এই শতকরা ৭ জনের মধ্যে আবার যেখানে বাসা খালি আছে সেখানে যেতে চায় না। কিন্তু যেখানে খালি নেই, দেখা যায় সেখানে একটা বাসা খালি হলে ১শ’ থেকে ২শ’ জন যেতে চায়। একটা অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। যে যেভাবে পারে তদবির শুরু করে দেয়। এই অসম প্রতিযোগিতা, অনৈতিক তদবির বন্ধ করার জন্য আমরা বরাদ্দ কার্যক্রম অনলাইনে নিয়ে এসেছি। আগের মত আবেদন করে রেখে দিলেই হবে না। এখন পদ্ধতি হচ্ছে- বাসা যেটা খালি হবে, সেটা আমরা অনলাইনে দিয়ে দেবো। সেটার বিপরীতে ১শ’, ২শ’, ৫শ’ যতজন খুশি আবেদন করতে পারবেন। অনলাইনেই নীতিমালা ঠিক করে রাখা আছে। সফট্ওয়্যার যাকে এক নম্বর করে দেবে তিনি পাবেন বরাদ্দ। সফট্ওয়্যারই ঠিক করবে কে পাবে বাসা।

পূর্বে বরাদ্দ নির্ধারণ কমিটির সভার মাধ্যমে হতো, সেই সভাটি আর হবে কি-না জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, সভাটি আমরা আইনের মধ্যে নিয়ে এসেছি। একজন প্রার্থী অনলাইনে যখন আবেদন করবেন তখন প্রয়োজনীয় অনেকগুলো কাগজপত্র সাবমিট করতে হয়। ওই কাগজপত্রগুলো ঠিক আছে নাকি সমস্যা আছে সেগুলো যাচাই করার জন্য আমরা সভা করবো। ওই সভা করে যাদের কাগজপত্রগুলো সঠিক, সেগুলো আপলোড করে দেবো। আর যেসব আবেদনে ভুল থাকবে সেগুলোও আপলোড হবে, তবে লটারিতে অংশগ্রহণ হবে না। সেগুলোয় কি সমস্যা তা মন্তব্য হিসেবে বলে দেওয়া হবে। একজন ব্যক্তি প্রতি মাসে তিনটি বাসার বিপরীতে আবেদন করতে পারবেন। প্রথমবার আবেদনের সময় কাগজপত্র আপলোড করা হলে প্রার্থীর নামে ওয়েবসাইটে একটি প্রোফাইল তৈরি হয়ে থাকবে। তাহলে প্রতিবার আবেদনের সময় কাগজপত্রগুলো আপলোড দিতে হবে না।

আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক আব্দুস সবুর মন্ডল পিএএ

আবাসন পরিদপ্তর পরিচালক আরো বলেন, এই পদ্ধতি আমরা মাত্র শুরু করেছি। সফট্ওয়্যারে এখন শুধু নতুন বাসার তালিকা দেয়া আছে। পুরাতন বাসা খালি নেই বিধায় দেয়া হয়নি। আরেকটা সুবিধা হলো, আগে দেখা যায় একটা বাসা খালি হওয়ার ৬ মাস বা এক বছর আগেই বরাদ্দ দেওয়া হতো। ফাঁকা হলে পরে উঠবে। কিন্তু এখন আর তা হবে না। বাসা খালি হওয়ার পর আগে অনলাইনে দেয়া হবে, তারপর আবেদন করে বরাদ্দ নিতে হবে। এতে করে, বরাদ্দপ্রাপ্তকে অপেক্ষায় থাকতে হবে না। যিনি পাবেন তিনি সঙ্গে সঙ্গেই উঠতে পারবেন। এটা আমরা সফল করার চেষ্টা করছি। আশা করি সফল হবো ইনশাল্লাহ। সফল হলে বাসা বরাদ্দ নিয়ে যে বিভিন্ন ধরণের অভিযোগ শোনা যায় সেটা আশা করছি থাকবে না।

বাসা বরাদ্দ পেতে সিন্ডিকেটের ঘুষ বাণিজ্য প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে মোঃ আব্দুস সবুর মন্ডল পিএএ বলেন, এই দপ্তরে বহুদিন ধরেই এ ধরণের বিষয় প্রচলন আছে। এগুলো বন্ধ করার জন্যই সরকার আমাকে এখানে দিয়েছে এবং বেশ কিছু কাজও আমি করেছি। ওই সব অভিযোগ সত্য নাকি মিথ্যা সেটা যাচাইয়ে আমি যাইনি। পরবর্তীতে যেন আর কোনো অভিযোগ না থাকে, সেটা নিয়ে কাজ করেছি আমি এবং সেই কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই দপ্তরের অপরিচ্ছন্নতা শিগগিরই পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। এই কার্যক্রমে প্রতিমন্ত্রী ও সচিব মহোদয় তথা সরকার পূর্ণ সহযোগিতা করছে।

এখনো অনেকে ঘুষ লেনদেনের চুক্তি করছে, এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এই কর্মকর্তা বলেন, ভালো কাজ করতে গেলে অনেকেরই তা পছন্দ হবে না। আমার পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমের কারণে অনেকেই সুস্থ নেই। কে কী করছে জানা নেই, তবে ধরা পড়লেই তার অবস্থা শেষ।

আবাসন পরিদপ্তরের এই কর্তা বলেছেন, কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা আনার প্রক্রিয়া এই দপ্তরের অনেকেরই হয়তো পছন্দ হচ্ছে না। আবার অনেকেই চান দীর্ঘ দিনের দুর্নাম ঘুচে যাক।
তিনি আরো বলেন, আমি করোনা পরিস্থিতির মাঝে দায়িত্বে এসেছি। তবে আমার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আমি আসার আগে এই দপ্তরের অনেক কর্মচারী বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ শোনা গেলেও কাকতালীয়ভাবে আমি আসার পর থেকে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আসেনি। তবে সবার বিষয়ে জিরো টলারেন্স। অভিযোগ পেলেই সঙ্গে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর অভিযোগ যেন না-ই আসে সেই পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে।

সংবাদটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান এখানেই

তারিখে ক্লিক করে সংবাদ পড়ুন

November 2020
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 

সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা

সবচেয়ে বেশি পড়া হয়েছে

আজ

  • শুক্রবার (রাত ১০:৪১)
  • ২৭শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ১২ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি
  • ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ফেসবুক-ইউটিউবে আমাদের সঙ্গে থাকুন

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

সবচেয়ে বেশি পড়া হয়েছে

language change »